সুপার শপ ব্যবসা সুবিধা এবং চ্যালেঞ্জসমূহ

সুপার শপ ব্যবসা

সুপার শপ ব্যবসা

দিন দিন জীবন যাত্রার মান বাড়ছে, মানুষের হাতে সময় কমছে। টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার এই লড়াইয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াতে হয়। যা প্রভাব ফেলছে আমাদের দৈনিন্দন জীবনে। আমরা এখন স্বল্প সময়ে, কিভাবে এবং কত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারি, সেই চেষ্টা করি। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা চাই একই জায়গায় সবকিছু পেতে।

প্রতিদিন সময় যত বাঁচাতে পারবো, ততই আমাদের লাভ। এই সময়ের বাঁচানোর বিষয়টি নিয়ে আপনি যদি ব্যবসা করতে পারেন, তবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি।

সুপার শপ ব্যবসা বর্তমান সময়ে বেশ জনপ্রিয় একটি ব্যবসাক্ষেত্র। এর কারন হল, মানুষ এক জায়গায় সমস্ত কিছু পাচ্ছে এবং সময় বাঁচাতে সক্ষম হচ্ছে। সময় বাঁচানো এবং মান সম্মত সেবা ও পণ্য দিতে পারলে এই ব্যবসা সফলতার সাথে পরিচালনা করা সম্ভব।

একটা সময় ছিল, বাজার করা আমাদের কাছে দিনের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি বিষয় ছিল। কারন বাজার করার সময় আশেপাশে মানুষের সাথে আলাপচারিতা হয়, সামাজিক সম্পর্কের একটি মাধ্যম ছিল এটি।

কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে। কর্ম ব্যস্ততার এই জীবনে আমাদের হাতে সময় খুব অল্প। নারীরাও এখন কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই যখন কর্ম ব্যস্ত, তখন বাজার করাটি দিনের অন্যতম একটি সমস্যা। এই সমস্যার সমাধানে নিয়ে ব্যবসায় আসতে পারলে, আপনি বেশ ভাল ব্যবসা করতে পারেন।

সুপার শপ শুনলেই আমরা ভাবি অনেক বড় কিছু, কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন। আসলেই বড় আকারের সুপার শপের জন্য কোটি কোটি টাকা প্রয়োজন। তবে আপনি চাইলে ছোট আকারের সুপার শপও করতে পারেন।

অপেক্ষাকৃত কম পুঁজিতে আপনি চাইলে সুপার শপের ব্যবসা করতে পারেন। অনেকেই আছে বড় বড় সুপার শপে যেতে চান না, আবার দূরত্বও একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায় । এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব।

সুপার শপ কি?

সুপার শপ হল এমন একটি শপ যেখানে এক ছাদের নিচে পাওয়া যায় নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিস। চাল, ডাল, তেল, লবন, শাক সবজি, প্যাকেটজাত পণ্য, সফট ড্রিংকস, চকঔেঁ, মাছ-মাংস ইত্যাদি। এর সাথে রান্নার সামগ্রী, বিভিন্ন উপকরণ সহ নানা জিনিস থাকে। সুতরাং মানুষ এক জায়গায় সকল পণ্য পায় এবং সময় বাঁচে।

বড় বড় সুপার শপে জামা-কাপড়, গহনা সহ আরো অনেক জিনিস থাক। আপনি ছোট আকারের সুপার শপের জন্য এই বিষয়গুলি বাদ দিতে পারেন।

নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবসায় লস খুব কম হয়, কারন এসব পণ্যের চাহিদা থাকে অনেক বেশি।

আপনি যদি মান সম্মত পণ্য এবং ভাল সেবা দিতে পারেন তবে ব্যবসা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে কয়েক গুন।

সুপার শপ ব্যবসার জন্য যা যা প্রয়োজন

১। ব্যবসার মূলধন

সুপার শপের জন্য অনেক বেশি মূলধন প্রয়োজন, তবে ছোট আকারের সুপার শপের জন্য কম মূলধন দিয়েও শুরু করা সম্ভব। এধরনের ব্যবসা ১৫ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

২। কি কি পণ্য থাকবে

সুপার শপে বিভিন্ন ধরনের পণ্য থাকে। অপেক্ষাকৃত বড় সুপার শপে অনেক বেশি পণ্য থাকে। তবে ছোট সুপার শপের ক্ষেত্রে আপনাকে ভাবতে হবে আপনি আপনার সুপার শপে কি কি পণ্য রাখবেন।

যদি শাকসবজি এবং মাছ মাংসের ব্যবস্থা থাকে তাহলে এই সব জিনিস কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন, সংরক্ষন পদ্ধতি সহ নানা বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। অন্যান্য পণ্যের জন্য আপনি ডিলারের সাথে আলোচনা করতে পারেন।

৩। সম্ভাব্য ক্রেতা এবং তাদের চাহিদা

সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থাভেদে ক্রেতার চাহিদা ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। আর তাই কোন এলাকায় এবং কাদের জন্য আপনি ব্যবসা করছেন এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি যদি শহরের কোন ভাল আবাসিক এলাকায় সুপার শপের আয়োজন করেন তবে এক ধরনের পণ্যের চাহিদা থাকে।

আবার অন্য অঞ্চলে সুপার শপ হলে পণ্যের চাহিদার ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। মূলত আপনার সম্ভাব্য ক্রেতা এবং তাদের চাহিদার কথাও চিন্তা করতে হবে।

৪। পণ্যের মান, দাম এবং সেবা

আপনি যখন ছোট আকারের সুপার শপ করবেন আপনার ক্রেতার পরিমান বেড়ে যাবে। প্রায় সকল শ্রেনীর মানুষই আপনার সম্ভাব্য ক্রেতা।

তাই পণ্যের মূল্য নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করা উচিত। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের যদি অতিরিক্ত দাম নির্ধারিত হয়, তবে আপনি ক্রেতা হারিয়ে ফেলবেন, ধরে রাখতে পারবেন না।

আবার আপনি যদি ক্রেতাকে বিশেষ কোন সুবিধা দিতে পারেন তবে ক্রেতা আপনার সুপার শপের প্রতি আকৃষ্ট হবেন। যেমন- হোম ডেলিভারি সার্ভিস।

ছোট আকারের সুপার শপের সুবিধাসমূহ

১। তুলনামূলক কম মূলধন

ছোট আকারের সুপার শপ আপনি চাইলে কম টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করতে পারেন। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ না করে, বরং ১৫ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে আপনি ব্যবসা শুরু করতে পারেন এবং প্রয়োজনে পরিস্থিতি বুঝে আপনি মূলধন বাড়াতে পারেন। মূলত মূলধন নির্ভর করবে স্থানের অবস্থান ও দোকানের সাইজের উপর।

২। চাহিদা প্রচুর

সুপার শপের বেশি অংশ জুড়েই থাকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। সুতরাং সময় যেমনই হোক না কেন, মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা কখনোই কমে না। সুতরাং এটি সুপার শপের অন্যতম সুবিধার একটি।

৩। স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব

আপনার ছোট আকারের সুপার শপের জন্য অধিক জায়গার আবশ্যকতা নাই। বড় বড় সুপার শপগুলোর জন্য অনেক বেশি জায়গার প্রয়োজন।

শহরাঞ্চলে এমন বড় জায়গা খুঁজে পাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং ব্যয়সাপেক্ষ।

ছোট আকারের সুপার শপের জন্য আপনি এই সমস্যার থেকে কিছুটা নিস্কৃতি পাবেন বলেই আশা করছি।

৪। অফলাইন এবং অনলাইন সুবিধা

আপনি যদি সরাসরি ব্যবসার পাশাপাশি, অনলাইনেও আপনার ব্যবসাটি নিয়ে আসতে পারেন তবে আরো বেশি লাভবান হয়ে উঠতে পারবেন। দিন দিন আমাদের দেশে অনলাইন সেবার চাহিদা বাড়ছে। আর তাই এই সেবাটি চালু করে আপনি আপনার ব্যবসার মান বাড়িয়ে ফেলতে পারেন অনেকটা।

৫। তুলনামূলক কম সংখ্যক কর্মী দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব

সুপার শপ গুলোতে ক্রেতা নিজেই নিজের পছন্দের পণ্যটি খুঁজে বের করে এবং কাউন্টার পর্যন্ত নিয়ে আসে। দাম অনুসারে টাকা নেওয়া এবং পণ্য প্যাকেটজাত করাই এখানে মূল কাজ। সুতরাং কম সংখ্যক কর্মী দিয়েই ব্যবসাটি সুন্দর ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

৬। এক জন ক্রেতার কাছে অনেক পণ্য বিক্রি করা সম্ভব

ছোট আকারের সুপার শপে থেকে সাধারণত ক্রেতা মাসিক বাজার করে। সুতরাং এক বারেই বেশ অনেক পণ্য বিক্রি করা সম্ভব। আবার প্রতিদিনের বাজার তো আছেই। অর্থ্যাৎ একজন ক্রেতাই অনেক গুলো পণ্য আপনার থেকে কিনছেন, এটিও একটি বড় সুবিধা। মাসিক পণ্যের ক্রেতা ধরে রাখতে পারলে বেশ লাভ করা সম্ভব।

আরো বিজনেস আইডিয়াঃ

ছোট আকারের সুপার শপের চ্যালেঞ্জসমূহ

১। ব্যবসার অবস্থান

ছোট আকারের সুপার শপের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হল লোকেশন। উচ্চবৃৃত্ত শ্রেনী সাধারণত ছোট সুপার শপ গুলোতে যাবেন না, এটাই ধারনা করা হয়। তাদের কাছে বড় বড় শপিংমল এবং সুপার শপগুলোর প্রতি আকর্ষন বেশি।

এমন অবস্থায় আপনি যদি স্বনামধন্য একটি ধনী এলাকায় ছোট আকারের সুপার শপ দেন, তবে কতজন ক্রেতা পাবেন সে বিষয়ে ভাবতে হবে।

আবার মধ্যবৃত্ত শ্রেণীর জন্য আপনাকে এমন জায়গায় শপটি নিতে হবে যেখানে সহজেই বিভিন্ন পেশার মানুষ আসতে পারে। আর তাই ছোট আকারের সুপার শপের জন্য লোকেশন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আরো পড়ুন – ব্যবসায় লোকেশনের গুরুত্ব

২। ক্রেতা ধরে রাখা

আপনার ব্যবসা ধরে রাখার জন্য, আপনাকে ক্রেতা ধরে রাখতে হবে। অন্য কোথাও যদি ক্রেতা কম দামে এবং ভাল সার্ভিসে ভাল পণ্য পায়, তবে সেটি আপানর ব্যবসার জন্য বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর তাই ক্রেতা বাড়ানোর সাথে সাথে আপনাকে ক্রেতা ধরে রাখার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

৩। পুঁজি

আপনার পণ্য ও সেবার চাহিদা যখন বেড়ে যাবে তখন আপনার ব্যবসা বড় করার প্রয়োজন পড়বে। ক্রেতার চাহিদা পূরন করা, আপনার তখন টিকে থাকার লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার।

ক্রেতা আপনার থেকেই চাইছে কিন্তু পাচ্ছে না এটি যেমন আপনার জন্য কষ্টদায়ক এবং একই সাথে ব্যবসার জন্যও ক্ষতিকারক।

সুতরাং ছোট আকারে শুরু করলেও ব্যবসার অবস্থা বুঝে লভ্যাংশ থেকে সঞ্চয় করতে পারেন ভবিষ্যৎতের মূলধনের জন্য। যা আপনার এগিয়ে যাওয়ার পথকে সহজ করে তুলবে।

ভিজিট করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল – Bangla Preneur YouTube Channel 

৪। প্রতিযোগিতা বেশি

ছোট আকারের সুপার শপ হিসাবে বড় বড় সুপার শপগুলো যেমন আপনার প্রতিযোগি, ঠিক তেমনি ডির্পামেন্টাল স্টোর, কাঁচাবাজারগুলোও আপনার প্রতিযোগি।

ক্রেতার কাছে আপনাকে প্রমান করতে হবে কেন আপনিই সেরা  এবং ক্রেতা কি কি বাড়তি সুবিধা আপনার কাছ থেকে পাবেন। কখনোই মান নিয়ে আপোষ করা যাবে না ।

ছোট আকারের সুপার শপ বর্তমান সময়ে চাহিদা সমৃদ্ধ একটি ব্যবসা ক্ষেত্র। ক্রেতার কাছে গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠতে পারলে, অল্প সময়েই এই ব্যবসা থেকে ভাল পরিমান লাভ করা সম্ভব।