আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের পথে বাঁধাগুলো কি এবং কিভাবে তা অতিক্রম করা যায়

আর্থিক স্বাধীনতা

আমরা সবাই আর্থিক স্বাধীনতা চাই। কিন্তু কি এই আর্থিক স্বাধীনতা? আর্থিক স্বাধীনতাকে খুব সাধারণ ভাবে বলতে গেলে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যখন অর্থ নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন থাকে না।

কখন অর্থ নিয়ে ভাবার বা চিন্তা করার প্রয়োজন হয় না? যখন আপনার কাছে প্রয়োজনের থেকেও আরো অনেক বেশি টাকা থাকে তখন টাকা নিয়ে চিন্তা করার আর প্রয়োজন হয় না।

আমরা সকলেই আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে চাই। কিন্তু পারি না। আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে বেশ কিছু বাঁধা কাজ করে। আজ আমরা আলোচনা করবো আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে বাঁধাগুলো কি কি এবং সেই বাঁধা উত্তরণের উপায় সমূহ।

বাঁধা ১: স্থির লক্ষ্য এবং পরিকল্পনার অভাব

আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি জীবনে বড় কিছু হতে চাইলে আগে লক্ষ্য স্থির করতে হয়। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগত জীবনে কতজন সেই কথা কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছি? মাঝি বিহীন নৌকা যেমন কূলে পৌঁছতে পারে না, সঠিক এবং পরিকল্পিত লক্ষ্য ছাড়া আপনিও তেমনি আথির্ক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবেন না।

যেমন ধরুন আপনি যদি খুলনা থেকে ঢাকায় যেতে চান। আপনি বাসে, ট্রেনে কিংবা প্লেনে করে যেতে পারবেন। আবার চাইলে গাড়িতে করেও আপনি যেতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি না জানেন আপনি কোথায় যেতে চান তাহলে কখনই আপনি সেখানে পৌঁছাতে পারবেন না।

উত্তরণের উপায়: আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আপনাকে অবশ্যই আগেই লক্ষ্য স্থির করতে হবে প্রত্যেকেরই জীবনের চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন। আপনি আপনার জন্য কেমন জীবন চান সেটি আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে এবং সেই ভাবে এগিয়ে চলতে হবে।

জীবনে আপনি কি অর্জন করতে চান সেটি আগে সিদ্ধান্ত নিন। এরপর কিভাবে অর্জন করবেন, সেটি ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে নিন।

যেমন আপনি যদি চিন্তা করেন আপনার একটি বাড়ি, একটি গাড়ি এবং ব্যাংকে ১ কোটি টাকা থাকলে আপনি খুশি। তবে নিজের ভিতর পরিকল্পনা করুন এমন ভাবে যে আগামী ৫ বছরের মধ্যে আপনি বাড়ি করতে সক্ষম হবেন এবং ৫ বছরে ১০ লক্ষ টাকা সঞ্চয় করবেন।

আপনি একটি বৃহৎ কাজকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে নিতে পারলে দেখবেন কাজটি সহজ হয়ে যাবে এবং সুন্দর ভাবে সম্পন্নও হবে। সুতরাং আর্থিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে চাইলে আগেই লক্ষ্য স্থির করুন এবং সঠিক পরিকল্পনা করুন।

বাঁধা ২: বাজেট অনুসারে না চলা

অনেকেই আছে যারা টাকা খরচ করেন এটা বোঝানোর জন্য যে তার অনেক টাকা আছে। আপনিও চাইলে এমন করতে পারেন। তবে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের পর এমন আচরণ করাই শ্রেয়। বরং টাকা খরচ করুন টাকা তৈরী করার জন্য।

বাজেট অনুসারে চলতে না পারা আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা। আপনি যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করবেন তখনই আপনি সঞ্চয় করতে কিংবা পরবর্তী বিনিয়োগে যেতে পারবেন না। বাজেট অনুসারে চলতে না পারলে আপনি যত টাকাই আয় করুন না কেন, ফলাফল শূণ্য।

উত্তরণের উপায়: আপনাকে প্রথমেই নিজের প্রতিটি খরচের জন্য বাজেট তৈরী করতে হবে। এবং শুধু তৈরী করলে হবে না আপনাকে সেই বাজেট অবশ্যই মানতে হবে। নিজের প্রতিদিনের খরচের জন্যও নির্দিষ্ট বাজেট রাখুন।

বাজেট অনুসারে চলতে পারলে আপনি সঞ্চয় করতে পারবেন। আপনার যদি আগামী ২ বছরের চলার মতো টাকা সঞ্চিত থাকে তবে আপনি নিজেকে কিছুটা আর্থিকভাবে সচ্ছল বলতে পারবেন। তাই বাজেট অনুসারে জীবন যাপনের চেষ্টা করুন।

বাঁধা ৩: অনিয়ন্ত্রিত খরচ

অনিয়ন্ত্রিত খরচ আপনার আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা। আমরা টাকা উপার্জন করি নিশ্চয় আমাদের ব্যক্তিগত চাহিদা মেটানোর জন্য।

কিন্তু চাহিদা এবং বিলাসিতার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। নিজের খরচের ওপর নিয়ন্ত্রন না করতে পারলে আপনি কখনোই সঞ্চয় এবয় পরবর্তীতে বিনিয়োগে আসতে পারবেন না। আপনাকে টাকা দিয়েই টাকা বানাতে হবে।

সেই টাকা যদি আপনি  লাগামহীন ভাবে খরচ করেন তবে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

উত্তরণের উপায়: আর্থিকভাবে সচ্ছলতা পেতে চাইলে আজই আপনার খরচের উপর নিয়ন্ত্রন রাখুন। কত টাকা কিভাবে এবং কেন খরচ করছেন তার হিসাব রাখুন।

আপনার টাকার হিসাব কেউ আপনার কাছে না চাইলেও  নিজের কাছে নিজের জবাবদিহিতার বিষয়টি রাখুন। দিন শেষে অতিরিক্ত খরচের হিসাব দেখলে নিজেরই আত্ম-উপলব্ধি আসবে এবং আপনি নিজেই নিজের খরচ নিয়ন্ত্রন করা শুরু করবেন।

বাঁধা ৪: ঋণ

ঋণের প্রতি আমাদের অনেকেরই আকর্ষন আছে। বাংলায় একটি কথা আছে, ”ধার করে ঘি-ভাত খেতে হয় না” এর অর্থ ধার করে ভাল কিছু খাওয়ার চেয়ে বরং নিজের টাকায় পান্তা ভাত খাওয়া অনেক ভাল। তবে সবল ঋণ খারাপ না।

জীবনের প্রয়োজনে কিংবা কোন বিশেষ কাজে ঋণ নিতে হতে পারে। সেটি ভালও হতে পারে। কিন্তু ঋণ নেওয়ার আগে আমাদেরকে অবশ্যই ভাবনা চিন্তা করেই নেওয়া উচিত।

উত্তরণের উপায়: একান্ত প্রয়োজনে কিংবা বড় কোন পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে ঋণ করার প্রয়োজন হলে আগেই পরিকল্পনা করুন ঋণকৃত টাকা কিভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করবেন। এবং সেইসাথে ঋণকৃত টাকা যে কাজের জন্য গ্রহন করেছেন সেটি কিভাবে খরচ করবেন।

চেষ্টা করবেন সেখান থেকেও কিছু টাকা বাঁচিয়ে রাখতে। তাহলে আপনার ওপর চাপ কমে আসবে। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে ঋণ না নেওয়াই উত্তম । তবে ঋণ নিতে হলে অবশ্যই পরিকল্পনা থাকতে হবে।

বাঁধা ৫: জরুরী তহবিল না রাখা:

জীবন পুরোটাই অনিশ্চিত। যেখানে আগামীকালের সূর্য্য আমি দেখবো কিনা সেটিই অনিশ্চিত, সেখানে কোন জিনিসের নিশ্চিয়তা আছে একবার ভাবুন। আমরা টাকা উপার্জন করি আর খরচ করি। কিন্তু বিপদ আসতে পারে যেকোন সময়ে।

বেকারত্ব, মৃত্যু, অসুস্থতা, আইনি কোন সমস্যা কিংবা প্রাকৃতিক দূর্য়োগ যেকোন সময়ে আসতে পারে। আপনি যদি সেই সবের জন্য প্রস্তুত না থাকেন তবে আপনি নিজেকে ভাগ্যের হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং এভাবে আপনি আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবেন না

উত্তরণের উপায়: বীমা কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে ঘিরেই হয়। ভবিষ্যতে কিছু খারাপ হতে পারে ভেবেই আগাম প্রস্তুতি নেয় মানুষ। আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের জন্য আপানকেও আগাম প্রস্তুত নিতে হবে।

হঠাৎ কোন চাকুরি কিংবা অসুস্থতা দেখা দিলে আপনার স্বাভাবিক জীবন যাপনের মান যেন কমে না যায় সেজন্য আগেই জরুরি প্রয়োজনের জন্য আলাদা ফান্ড রাখুন এবং সেখাসে কমপক্ষে ৬ মাস চলার মতো টাকা সঞ্চয় রাখুন।

বাঁধা ৬: মুদ্রাস্ফীতি:

মুদ্রাস্ফীতি আর্থিক সচ্ছলতার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাঁধা। আপনি গত বছর ১০০০ টাকা দিয়ে যা কিনতে পারতেন এই বছর সেই টাকা দিয়ে আরো কম জিনিস কিনতে পারবেন। দিন দিন টাকার মান কমে যেতে থাকে। তাই আজকের ৫ লাখ টাকা দিয়ে আপনি যা যা করতে পারবেন, আগামী ৫ বছর পর ৫ লাখ টাকা দিয়ে আপনি সেই কাজ করতে সর্মথ হবেন না।

উত্তরণের উপায়: মুদ্রাস্পীতি সম্পদের নিরব শত্রু। এই মুদ্রাস্ফীতি থামানোর উপায় আমাদেও হাতে নেই। তাই আমাদের একটু কৌশলী হতে হবে। আপনি টাকা অলস ফেলে না রেখে বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন। তাহলে আপনার  টাকার পরিমান বাড়বে এং ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতির কারনে লোকসানের সম্ভাবনাও কমে যাবে।

আমরা সবাই চাই অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। এমন একটি জীবন যেখানে টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না এবং এর ফলে কাজও হবে ঐচ্ছিক। অর্থ্যাৎ যখন কাজ করতে ইচ্ছে করবে তখনই কাজ করবেন। অর্থনৈতিক এই স্বাধীনতা একদিনে অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত চেষ্টা এবং ধারাবহিকতা বজায় রাখলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা অসম্ভবও নয়।