বিনিয়োগ করবেন কোথায় ব্যাংক না শেয়ার বাজারে

বিনিয়োগ করবেন কোথায়, ব্যাংক না শেয়ার বাজারে_

হাতে গোনা কয়েকটা সেক্টর ছাড়া আমাদের দেশে টাকা বিনিয়োগ করার খুব বেশি জায়গা নেই। আজকের আমার এই আর্টিকেলের আলাচ্য বিষয়- ব্যাংক এবং শেয়ার বাজারে টাকা বিনিয়োগের সুবিধা ও অসুবিধা একই সাথে এই দুইয়ের মধ্যে সেরা মাধ্যমটি খুঁজে বের করা।

এক নজরে ব্যাংক এ টাকা রাখার সুবিধাগুলো

#১। সুদ পাওয়া যায়।

#২। জমাকৃত টাকা নিয়ে চিন্তা থাকে না।

#৩। প্রতিমাসে কনফার্ম ইনকাম করা যায়।

#৪। আবেদন করলে কম সময়ের মধ্যে টাকা উঠিয়ে নেওয়া যায়।

#৫। জমাকৃত টাকার উপর লোন পাওয়া যায়।

ব্যাংকে টাকা রাখার অসুবিধাগুলো

#১। সুদ খাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ এবং সম্পূর্ণ হারাম কাজ। শুধু ইসলামেই নয়, সুদ প্রতিটি ধর্মেই হারাম। ইহুদি, খ্রিস্টান ও হিন্দু ধর্মগ্রন্থেও সুদ নিষেদ্ধের বর্ণনা এসেছে পরিষ্কারভাবে।

#২। ব্যাংক এ টাকা রেখে আপনি যেই টাকা রিটান পাবেন তা দিয়ে মূল্যস্ফীতির ঘাটতি মেটাতে পারবেন না। ব্যাংক এ টাকা রেখে মূল্যস্ফীতি ও টাকার ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে বছর শেষে আসল টাকা কমে যাবে।

বর্তমানে ব্যাংকভেদে এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদের সর্বোচ্চ হার ৬ শতাংশ। তাও খুব কম সংখ্যক ব্যাংক’ই এই পরিমান সুদ দিয়ে থাকে। গড়ে এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদের হার ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

ধরুন, আপনি ৫ লাখ টাকা এক বছরের জন্য ব্যাংক এ রাখবেন। এক বছরে ব্যাংক আপনাকে ৩০ হাজার টাকা সুদ বা interest দিবে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, চেক বইয়ের জন্য টাকা, মোবাইল এলাট, সরকারী tax সহ নানা কারনে ৪১৬৭ টাকা কেটে নিয়ে যাবে।

ফলাফল, বছরে ৫ লাখ টাকা ব্যাংক এ রেখে আপনি পাবেন ২৫ হাজার ৮৬৭ টাকা ৫০ পয়সার মত। যা ৫ লাখ টাকায় প্রতি মাসের হিসাবে পাবেন ২ হাজার ১৫৫ টাকা।

এবার আসুন মূল্যস্ফীতির বিষয়ে, এক বছর আগে যে পণ্য বা সেবার জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, বর্তমানে সেই পণ্য বা সেবার জন্য ১০৫ টাকা ২৯ পয়সা খরচ করতে হবে।

ফলাফল, ব্যাংকে টাকা রেখে যে পরিমান সুদ পাবেন, তা দিয়ে এই মূল্যস্ফীতির ঘাটতি মেটাতে পারবেন না। তাই মূল্যস্ফীতি ও টাকার ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক এ টাকা রাখলে বছর শেষে মূল টাকাই কমে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে টাকা বিনিয়োগের জন্য খুব বেশি দরজা খোলা নেই। সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক গ্রাহকদের কাছে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসাবে বিবেচিত হলেও বছর শেষে গ্রাহক তার নিজের টাকা নিজেই কমিয়ে ফেলছে।

বাংলাদেশে গুটি কয়েক লোক শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করছে। এখানে গুটি কয়েক বললাম এই কারনে যে, আমাদের দেশে মাএ ১২ থেকে ১৫ লাখ মানুষ সরাসরি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করছে।

শেয়ার বাজারে এত কম মানুষের সম্পৃক্ত থাকার পিছনে বেশ কিছু কারন আছে।

যেমন, শেয়ার বাজার সম্পর্কে সঠিক ধারনা না থাকা, শেয়ার বাজারকে জুয়া খেলার সাথে মিলিয়ে ফেলা, মূলধন হারিয়ে ফেলার ভয়, কিভাবে রিটান আসে তা না জান, মিডিয়ার অতিরিক্ত নেতিবাচক মনোভাব সহ আরো বেশ কিছু কারন থাকতে পারে।    

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের কিছু সুবিধা

#১। শেয়ার দাম উঠা নামার মাধ্যমে প্রফিট করা যায়।

#২। দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগে কোম্পানির লাভের উপর ডেভিডেন্ট পাওয়া যায়।

#৩। খুবই অল্প টাকা দিয়ে যেকোন নামাদামি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হওয়া যায়। যেমন ধরুন, আজকের বাজার দর অনুযায়ী মাত্র ৩৭৩ টাকা দিয়ে গ্রামীনফোনের মত একটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হতে পারবেন।

#৪। বিশাল পরিমানে শেয়ার কিনে কোম্পানির পরিচালনায় নিজকে সম্পৃক্ত করা যায়।

#৫। কত টাকা লাভে বা লসে থাকবেন তা যে কোন সময় দেখা যায়।

#৬। দেশের বা সমাজের জন্য ভালো কোনো খবরে শেয়ার বাজার চাঙ্গা থাকলে কম সময়ে বেশ ভালো টাকা লাভ করা যায়।

#৭। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেয়ে শেয়ার বাজারের বিও অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করার খরচ তুলনামূলক অনেক কম।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের কিছু অসুবিধা

#১। সঠিক জ্ঞান না থাকলে শেয়ার কিনে টাকা লস করতে পারেন।

#২। কোম্পানির পারফরমেন্স খারাপ করলে আপনার মূলধন কমে যেতে পারে।

#৩। শেয়ার বাজারেও হালাল এবং হারাম আছে। যেমন, যে সকল কোম্পানি সুদি ব্যবসা করে, কিংবা হারাম পন্য বানায় কিংবা হারাম সেবা দেয় সেই সকল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে তা আপনার জন্য হারাম বিনিয়োগ হবে।

ধরুন, আপনার কাছে ৫ লাখ টাকা রয়েছে যা আপনি বিনিয়োগ করতে চান।  আপনার সামনে ব্যাংক এবং শেয়ার বাজার খোলা রয়েছে, এবার আপনি কোথায় বিনিয়োগ করবেন?

আপনি যদি ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে রাখেন এবং মূল্যস্ফীতির বিষয়টা মাথায় না রাখেন, তবে ৫ লাখ টাকায় এক বছরে নিশ্চিত সুদ পাবেন ২৫ হাজার ৮৬৭ টাকা ৫০ পয়সার মত। যা প্রতি মাসের হিসাবে পাবেন ২ হাজার ১৫৫ টাকা।

এবার আপনি যদি এই একই পরিমান টাকা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন তবে কত টাকা নিশ্চিত লাভ করতে পারবেন তা কেউ বলতে পারবে না।

তবে সঠিক সময়ে সঠিক কোম্পানির শেয়ার উপযুক্ত দামে কিনতে পারলে ১ বছরে ব্যাঙ্কের সুদের চেয়ে ৪ গুন বা তার বেশি লাভ করা যায়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আপনি শেয়ার বাজারে ব্যবসা করতে আসবেন, সুদ খেতে নয়। যেহেতু আপনি ব্যবসা করতে আসবেন তাই লাভের পাশাপাশি এখানে ঝুঁকিও আছে তা মাথায় রাখতে হবে।

মূলত শেয়ার বাজারে লাভের কথা চিন্তা না করে কিভাবে ঝুঁকি কমানো যায় তা নিয়ে বেশি পরিকল্পনা করতে হবে। কেননা ঝুঁকি কমাতে পারলে আপনি অবশ্যই লাভ করতে পারবেন।

কিভাবে শেয়ার বাজারে টাকা বিনিয়োগে ঝুঁকি কমানো যায়

#১। সব টাকা দিয়ে একসাথে শেয়ার কিনবেন না।

ধরুন, আপনি ABC কোম্পানির শেয়ার কিনতে চান। এই ABC কোম্পানির একটি শেয়ারের দাম ১০ টাকা।

আপনার শেয়ার বাজারের জন্য টোটাল বাজেট ৫ লাখ টাকা।

এই অবস্থায় প্রথমে ১ লাখ টাকা দিয়ে ABC কোম্পানির ১০ হাজার শেয়ার কিনতে হবে।

এর পরে আপনার হাতে ৪ লাখ টাকা অবশিষ্ট থাকবে।

ধরুন ৭ দিন পরে এই ১০ টাকার শেয়ারের দাম হলো ১১ টাকা তখন আপনি বিক্রি করে দিন।

ফলে আপনার লাভ হবে ১০ হাজার টাকা।

আবার ধরুন, ৭ দিন পরে ঐ শেয়ারে দাম না বেড়ে কমে গেল। এখন ঐ শেয়ারের দাম ৯ টাকা।

এই অবস্থায় আপনার হাতে থাকা ৪ লাখ টাকার মধ্যে থেকে ৯০ হাজার টাকা দিয়ে ঐ ABC কোম্পানির আরো  ১০ হাজার শেয়ার কিনে ফেলুন।

এতে আপনার এভারেজে প্রতিটি শেয়ারের দাম হবে ৯ টাকা ৫০ পয়সা।

ধরুন, কিছু দিন পর ঐ শেয়ারের দাম হলো ১০ টাকা ৫০ পয়সা। তখন আপনার হাতে থাকা ২০ হাজার শেয়ার বিক্রি করে দিন, এতে আপনার ২০ হাজার টাকা লাভ হবে।

এই ভাবে দাম কমলে সম পরিমান শেয়ার কিনতে হবে এবং দাম বাড়লে তা বিক্রি করতে হবে। এই পদ্ধতি যদি আপনি সত্যিকার অর্থে অনুসরণ করতে পারেন তবে আমি বিশ্বাস করি আপনি ঝুঁকি মুক্ত ভাবে ব্যবসা করতে পারবেন।

#২। ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনতে হবে।

বর্তমানে শেয়ার বাজারে Mutual Fund সহ ৩৫০টির অধিক কোম্পানি আছে। এর মধ্যে থেকে আপনার জন্য সেরা কোম্পানির খুঁজে বের করতে হবে।

সাধারন চোখে যে সকল কোম্পানি বিগত বছরে ভালো ডেভিডেন্ট দিয়েছে, বাজারে যাদের সুনাম আছে, মালিকপক্ষ দক্ষতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে, বাজারে ঐ কোম্পানির শেয়ারে সব সময় লেনদেন ভালো হয়, ইত্যাদি নানা বিষয় বুঝে ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনতে হবে।

প্রাথমিক অবস্থায় নিজে বুঝতে না পারলে অভিজ্ঞ বিনয়োগকারিদের পরামর্শ নিতে পারেন, তবে তাদের পরামর্শ সব সময় সঠিক নাও হতে পারে। তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার পরে আপনার নিজস্ব গবেষণা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

#৩। বিনিয়োগের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে

এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, আপনি যদি ব্যাংক এ ১ বছরের জন্য টাকা রাখতেন তবে আপনি কিন্তু ঠিক’ই ১ বছর অপেক্ষা করতেন।

 ঠিক তেমনি শেয়ার বাজারে টাকা বিনিয়োগের ক্ষেএেও এই রকম সময়সীমা ঠিক করতে হবে।

কম পক্ষে ১ বছর আপনি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করবেন এই রকম মানসিকতা নিয়েই বাজারে আসুন, এতে আপনি অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবেন।

আরোও পড়ুন – শেয়ার বাজারে Long Term Investment করার সেরা সময় এই এখনই

#৪।  শেয়ার কেনার সময় জিতে কিনতে হবে

আপনি যেই কোম্পানির শেয়ার যেই দামে কিনতে চান, সেই দাম সেই কোম্পানি পাওয়ার যোগ্য কিনা তা বুঝতে হবে। 

ধরুন, আমি কাপড়ের ব্যবসা করি, একটি মোটামুটি ভালো কোয়ালিটির শার্টের দাম যদি হয় ৫০০ টাকা কিন্তু আমি যদি কেনার সময়ই ১০০০ হাজার টাকা দিয়ে কিনি, তবে সেই শার্ট বিক্রি করার সময় আমি লাভ নাও করতে পারি।

ঠিক তেমনি যেই শেয়ারের দাম ইতিপূর্বে অনেক বেড়ে গেছে, সেই সকল শেয়ার কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে।

#৫। ধারাবাহিক বিনিয়োগ বাড়ানো

শেয়ার বাজারের জন্য একটি চরম সত্য বিষয় হলো, যে যত বেশি টাকা নিয়ে বাজারে আসবে সে তত কম ঝুঁকিতে থাকবে।

ধরুন, আপনি ৫ লাখ টাকা নিয়ে বাজারে বিনিয়োগ শুরু করলেন, যা মোটামুটি ভালো একটি এমাউন্ট।

এখন এই ৫ লাখ টাকাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য যদি আপনি মাসিক ভিত্তিতে ৫ হাজার বা ১০ হাজার কিংবা আরো বেশি পরিমান টাকা দিয়ে আপনার মূলধন বাড়াতে পারেন তবে দিন শেষে আপনি ৮০ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের থেকে এগিয়ে থাকবেন।

শেষ কথা, আপনি যদি সুদ খেতে চান এবং কোন ধরনের রিস্ক নিতে না চান না তবে আপনার জন্য ব্যাংক-ই উত্তম।

আর যদি আপনি সুদ মুক্ত, নিজের বিবেক বুদ্ধি ও মেধা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করতে চান তবে শেয়ার বাজারে আসুন।

যত সম্ভব জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করুন এবং খুবই সামান্য পরিমান টাকা নিয়ে সরাসরি বিনিয়োগ করা শুরু করুন। অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিনিয়োগের পরিমান বাড়াতে পারবেন।

আপনার বিনিয়োগ ভালো থাকুক এই কামনা করি! – কে এম চিশতি সিয়াম – আমার ইউটিউব চ্যানেল