সাফল্যের জন্য জ্যাক মা-র ১০টি নীতি

সফলতার জন্য জ্যাক মা'র ১০টি নীতি

পৃথিবীর অন্যতম বড় অনলাইনভিত্তিক কোম্পানি আলিবাবা ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা। যার কাছে প্রত্যাখ্যান মানে সফলতার আরেক নাম

প্রাইমারি পরীক্ষায় ২ বার ফেল, মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৩ বার ফেল, ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় ৩ বার ফেল, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে ১০ আবেদন করে প্রত্যাখান হয়, চাকরি পরীক্ষায় ৩০ বার ফেল।

শুধু তাই নয়, যখন KFC প্রথমবার চায়নাতে আসে তখন তিনি KFC তে চাকরির জন্য আবেদন করে এবং ২৪ জনের মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হয়, একজনের চাকরি হয় না, সেই একজন হচ্ছে জ্যাক মা!

আজকে, সেই দিনের প্রচন্ড ব্যর্থ মানুষটি প্রায় ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক, যার ফলে তিনি বিশ্বে ২১তম এবং এশিয়ায় তৃতীয় শীর্ষ ধনী।

১৯৬৪ সালে জ্যাক মা’র জন্ম, ৩ ভাই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ছোট বেলা থেকেই তার ইংরেজী ভাষা শেখার প্রচন্ড ইচ্ছা ছিল।

তিনি  ইংরেজী ভাষা শেখার জন্য বিদেশীদের জন্য ফ্রীতে টুরিস্ট গাইড হিসাবে কাজ করত। এদিকে তিনি ইংরেজী ভাষায় আস্তে আস্তে দক্ষ হলেও গনিতে বার বার খারাপ করত।

এইভাবে ভালো খারাপ মিলিয়ে ১৯৮৮ সালে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে। পরবর্তীতে ডায়ানজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি প্রভাষক হিসাবে তার কর্ম জীবন শুরু করে।

১৯৯৪ সালে জ্যাক মা প্রথম ইন্টারনেটের সাথে পরিচিত হয়, ১৯৯৫ এর প্রথম দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান কালে ইন্টারনেটে বিয়ার ও অন্যান্য পানীয় সম্পর্কিত তথ্য খুঁজতে গিয়ে নানা দেশের তথ্য তার চোখে পরলেও চায়না সম্পর্কে কোন তথ্যই তিনি খুঁজে পায় নি।

এরপরে তিনি এবং তার বন্ধু চায়না সম্পর্কিত একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন। ৯:৪০ মিনিটে ওয়েবসাইটটি চালু করেছিলেন এবং রাত সাড়ে বারোটার মধ্যে জ্যাক মা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী কিছু চীনা বিনিয়োগকারীদের ইমেল পেয়েছিলেন। এর পরে যা হয় তা সবই ইতিহাস!

আসুন কিভাবে জীবনের শুরুর দিকে এতটা ব্যর্থ একজন মানুষ সফলতার স্বর্ণশিখরে যেতে পারে এর কিছু কারন, নীতি এবং পিছনের গল্প খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।

#১। প্রত্যাখ্যান সফলতার আরেক নাম

জ্যাক মা পুলিশ একাডেমিতে ঢুকতে চেয়েছিল কিন্তু হয়নি, হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ১০ বার আবেদন করেছিল কিন্তু হয়নি, KFC তে কাজ করার জন্য আবেদন করেছিল কিন্তু হয়নি।

তিনি জীবনে এত বেশী বার প্রত্যাখ্যান হয়েছে যখন একটি পর্যায়ে প্রত্যাখ্যানের ভয়টাই মনে থেকে দূর হয়ে যায়।

প্রত্যাখ্যানকে সফলতার সমার্থক শব্দ হিসেবে গ্রহন করা তার জীবনে সফলতার পেছনে বিশাল অবদান রাখে।

#২। আপনার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখুন

জ্যাক মা আলিবাবা’র বিজনেস আইডিয়া নিয়ে কথা বলার জন্য তার ২৪ জন বন্ধুদের বাসায় ঢাকলেন।

এর মধ্যে ২৩ জন বন্ধু তার এই বিজনেস আইডিয়া হেসে উড়িয়ে দিলেন, মাএ একজন ছাড়া।

একজন বন্ধু তার সাথে একমত হয়েছিল তাও আবার নানা শর্তে।

তখন যদি তার এই স্বপ্নকে বাচিয়ে রাখতে না পারতেন তবে হয়ত আজকে আলিবাবা’র কোন হদিস থাকত না।

ঠিক তেমনি দেখবেন আমাদের জীবনে এই রকম অনেক মানুষ আছে যারা বুজে হোক আর নাই বুজে হোক সবকিছুতেই না বলে দেয়।

আমাদের উচিত হবে, না’ বলা মানুষগুলোকে বাদ দিয়েই আমাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা।

#৩। নিজের মধ্যে থাকা প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তিকে জিইয়ে রাখা

ছোট বেলা থেকেই জ্যাক মা সফল হওয়ার প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তিকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

আলিবাবা শুরু আগে তিনি আরো ২/৩টি ব্যবসা শুরু করছিলেন যদিও তাতে কোন সফলতার মুখ দেখতে পারে নাই।

তখন তিনি যদি হতাশ হয়ে বসে থাকতেনন তবে হয়ত সফলতার মুখ দেখতে পারত না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যদি কোন কাজে ব্যর্থ হই এর মানে এই না যে আমাদের জীবনই ব্যর্থ।

#৩। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট হতে হবে

জ্যাক মা’র জীবনী আপনি যখনই পর্যাচলনা করবেন তখনই দেখবেন তার প্রতিটি কাজ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে বাস্তব রুপ দিয়েছে।

তিনি কি করতে চেয়েছিলেন তা তিনি জানত এবং সেই লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়েই কাজ করে গেছে অবিরত।

তিনি লক্ষ্যের ব্যাপারে কখনোই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, লক্ষ্য যখন সুনির্দিষ্ট, সাফল্য তখন সুনিশ্চিত তাই আমাদের কোন অবস্থাতেই লক্ষ্য ভুলে গেলে চলবে না।

#৪। সমালোচকদের উপেক্ষা করে সব সময় ইতিবাচক থাকুন

২০০৪ সালে যখন জ্যাক মা “আলি পে” চালু করতে চেয়েছিল তখন অনেক লোক তাকে বোকা বলেছিল।

জ্যাক মা এই সমস্ত নেতিবাচকতা বিবেচনায় না নিয়ে অধ্যবসায়ী ছিলেন।

আজকে চায়নাতে কোটি কোটি মানুষ আলি পে ব্যবহার করছে এবং ইউরোপে ব্যবসা প্রসারের কাজ চলছে।

আপনি যেই কাজই করতে চান না কেন সব কাজের মধ্যে কিছু সমালোচক পাবেন।

এদের সমালোচনা করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই।

যদি কোনো কাজে সফল হতে চান তবে অবশ্যই সকল ধরনের সমালোচকদের উপেক্ষা করে সব সময় ইতিবাচক থাকতে হবে।

মানুষ কি ভাববে তা যদি আপনি নিজেই ভেবে অস্থির হয়ে যান তবে মানুষ কি ভাববে?

#৫। গ্রাহকদেরকে ১ নাম্বারে রাখুন

জ্যাক মা গ্রাহকদেরকে প্রথম, কর্মচারীদের দ্বিতীয় এবং শেয়ারহোল্ডারদের তৃতীয় গুরুত্ব দিতে হবে এই দর্শনে বিশ্বাসী।

যেকোন ব্যবসায় কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার যাবে আবার আসবে কিন্তু কোন গ্রাহক একবার সেই ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আর আসবে না।

তাই গ্রাহকদের খুশী রাখতে পারলে ব্যবসা লাভের মুখ দেখতে পারে।

#৬। অভিযোগ করার বদলে সুযোগের সন্ধান করুন

যেকোন কিছুতেই অভিযোগ করা অনেক সহজ। জ্যাক মা বিশ্বাস করেন অভিযোগ করার বদলে সুযোগের সন্ধান করলে যে কোন কাজে বা ব্যবসায় সফল হওয়া যায়।

আপনার সাথে ভালো কিছু না ঘটলে অভিযোগ না করে ভালো কিছু ঘটানোর চেষ্টা করতে হবে।

#৭। একটি ভাল নাম নির্বাচন করুন

যে কোন ব্যবসায় একটি ভালো নাম খুবই গুরুত্ব বহন করে।

জ্যাক মা ব্যাখ্যা করেন তার কোম্পানি নাম আলিবাবা রেখেছেন যা আলি বাবা এবং চল্লিশ চোরদের কাহিনী থেকে এসেছে। এর কারন এই কাহিনী গোটা বিশ্ব জানে এবং মনোযোগ আকর্ষণে সহজ হবে।

আপনি যখন আপনার ব্যবসার নাম ঠিক করবেন তখন ছোট, অর্থবহ, উচ্চারণে সহজ নাম ঠিক করবেন যা মানুষ মনে রাখতে পারে।

#৮। সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণার মধ্যে থাকুন

জ্যাক মা সবসময় নিজেকে অনুপ্রেরণার মধ্যে রাখতে ভালবাসেন। দ্য গডফাদার এবং ফরেস্ট গাম্পের মতো চলচ্চিত্রের দ্বারা তিনি বহুবার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।

কিভাবে অভিনয় করে, কিভাবে গান করে, কিভাবে অভিনয় করে অন্যের মন জয় করে নেয় ইত্যাদি বিষয়গুলো জ্যাক মা’কে অনুপ্রেরণা নেয়।

অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই খোলা মনের অধিকারী হতে হবে এবং আপনার চারপাশের বিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

#৯। ব্যবসার সংস্কৃতি গড়ে তুলুন

আলিবাবা গ্রুপে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ কাজ করে। আলিবাবা এখন বিশ্বের নবম মূল্যবান ব্যান্ড।

জ্যাক মা সব সময় নিজের ব্যবসাকে নিজের মত করে সাজাতে চেয়েছে যেখানে গ্রাহকদেরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে, কর্মচারীদেরকে ভালবাসতে হবে।

#১০। কাজের প্রতি আবেগ থাকতে হবে

আপনি যেই কাজ করেন না কেন তার প্রতি যদি আবেগ না থাকে তবে কখনই সফল হতে পারবেন না।

জ্যাক মা বিশ্বাস করে, কাজের প্রতি আবেগ তাকে আজকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।