রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়ার ১২ টি প্রধান কারণ ও উত্তরণের উপায়

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়ার ১২ টি প্রধান কারণ ও উত্তরণের উপায়

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়ার কারন

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়ার কারন

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে সাধারণত অনেক টাকা বিনিয়োগের করা প্রয়োজন হয়। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে বিনিয়োগকৃত টাকা গুলো ঝুকিঁর মধ্যে থাকে। সঠিক পরিকল্পনা ও কি ধরনের সমস্যা হতে পারে সে গুলোর ব্যাপারে আগে থেকেই জানা না থাকায় বেশির ভাগ রেস্টুরেন্ট ব্যবসাই ব্যর্থ হয়।

তাই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হতে হলে সঠিক পরিকল্পনার পাশাপাশি সমস্যা গুলো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় সম্পর্কে জানা থাকতে হবে। এখানে আমরা রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কারণ এবং কিভাবে তা এড়িয়ে যাওয়া যায় সে সম্পর্কে আলোচনা করব। নিচে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

সঠিক অবস্থানে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু না করা

সঠিক অবস্থানের উপর রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সফলতা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। বেশির ভাগ রেস্টুরেন্ট ব্যবসাই সঠিক অবস্থানে স্থাপন না করার কারণে ব্যর্থ হয়।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় অভিজ্ঞতা না থাকায়

যে কোন ব্যবসায় সাফল্য লাভের মূল চাবিকাঠি হলো অভিজ্ঞতা। বেশী বা কম যেকোন অভিজ্ঞতা ছাড়া রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব।

ছোট খাটো বিষয় গুলোকে মূল্যায়ন না করা

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার পর বেশির ভাগ উদ্যোক্তা প্রথম দিন থেকেই মুনাফা লাভ করতে চান। ফলে মুনাফা লাভ করতে গিয়ে দক্ষ জনবল, দক্ষ হিসাবরক্ষক, সংকট কালিন মুহূর্ত থেকে উত্তরণের অগ্রিম পরিকল্পনা গ্রহণ ইত্যাদির মতো ছোট খাটো বিষয় গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আর এই কারণেও অনেক রেস্টুরেন্ট ব্যবসা ব্যর্থ হয়ে যায়।

রেস্টুরেন্ট মালিকের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা

অনেক রেস্টুরেন্ট মালিক মনে করেন যে একটি রেস্টুরেন্ট খোলার পর তা অটোমেটিক চলতে থাকবে। তাই তারা স্থান নির্বাচন করে রেস্টুরেন্টটি ভালো ভাবে ডেকোরেশন, জনবল নিয়োগ ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পর সহসায় আর রেস্টুরেন্টে উপস্থিত থাকেন না। এর ফলেও অনেক সময় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থ হতে হয়।

কর্মীদের কার্যকর বেতন ভাতা নির্ধারণ না করা

বেশির ভাগ রেস্টুরেন্ট মালিক বাস্তবতার নিরিখে রেস্টুরেন্ট কর্মীদের কার্যকর বেতন ভাতা নির্ধারণে ব্যর্থ হন। ফলে এই ব্যবসা সফলতার মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়।

ভুল পথে প্রচুর টাকা খরচ

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে অনেক জিনিসপত্র ক্রয় করতে হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় বেশির ভাগ উদ্যোক্তা অপ্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করে ফেলেন। ফলে পরবর্তীতে খাদ্য সরবরাহের জন্য যে পরিমাণ বাজেট দরকার হয় তার যোগান দেওয়া সম্ভব হয় না। এ জন্যও অনেক সময় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফলতা অর্জন করা যায় না।

গ্রাহক সেবার মান ভালো না হওয়া

যে কোন ব্যবসার সফলতার ক্ষেত্রে গ্রাহক পরিষেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ক্ষেত্রে তা বলার অপেক্ষাই রাখে না। কিন্তু অনেক রেস্টুরেন্টই গ্রাহকদেরকে মানানসই পরিষেবা প্রদান করে না। ফলে ব্যর্থতাকে বরণ করে নিতে হয়।

পর্যাপ্ত মার্কেটিং এর অভাব

অনেক রেস্টুরেন্ট মালিক যথাযথ ভাবে মার্কেটিং করেন না। ফলে রেস্টুরেন্ট ব্যবসাটি সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হয়।

ভাল ব্যবস্থাপনার অভাব

বেশির ভাগ রেস্টুরেন্ট মালিক বা ম্যানেজার তার ব্যবসাটিকে লাভজনক করতে বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে বিশ্লেষণ করতে পারে না। ফলে তার রেস্টুরেন্টে প্রতিদিন গড়ে আনুমানিক কত লোক খাচ্ছেন, তার রেস্টুরেন্টের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার কোনটি, কোন আইটেমটি বেশি লাভজনক তা নির্ণয় করতে ব্যর্থ হন। ফলশ্রুতিতে ব্যবসাটি সফলতার মুখ দেখতে পারে না।

খাবারের কোয়ালিটি ভালো না হওয়া

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল না হওয়ার সবচেয়ে কমন সমস্যা হলো খাবারের কোয়ালিটি ভালো না হওয়া। আর খাবারের কোয়ালিটি ভালো না হলে ব্যর্থতা সুনিশ্চিত।

খাবারের মেন্যুতে সমস্যা থাকা

অনেক রেস্টুরেন্টের মেন্যুতে বিশাল খাবারের লিস্ট থাকে। ফলে গ্রাহকরা অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। যা বিরক্তির কারণও বটে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারনা না করা

যুগের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে সংযুক্ত হতে হয়েছে। এক্ষেত্রে রেস্টুরেন্টকেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর মাধ্যমে অনেক বেশি মানুষের কাছে পরিচিত করানো যেতে পারে।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের উপায়

উপরে আমরা রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কয়েকটি কারণ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এখানে আমরা কিভাবে সমস্যা গুলোকে এড়িয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হওয়া যায় সে সম্পর্কে আলোচনা করবো।

১। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হতে হলে সঠিক অবস্থানে ব্যবসা স্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে মহাসড়কের পাশে এবং প্রতিদিন প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে এমন স্থান নির্বাচন করা খুবই জরুরী।

২। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় দুর্দান্ত সাফল্য পেতে অভিজ্ঞতা মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। অভিজ্ঞতা ছাড়া রেস্টুরেন্ট স্থাপন করে সহজে সফলতা পাওয়া যায় না। তাই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ব্যবসাটি শুরু করার পূর্বে কিছুদিন অন্য একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করা যেতে পারে। তাছাড়া এই ব্যবসাটি শুরু করার পূর্বে এই ব্যবসায় অভিজ্ঞ এমন ব্যক্তিদের নিকট হতে পরামর্শ গ্রহণ করাও জরুরী।

৩। রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার পর ছোট খাটো কোন বিষয়ও হেলাফেলা করা যাবে না। তাছাড়া জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ করা জরুরী।

৪। রেস্টুরেন্ট মালিককে অবস্থান নির্বাচন, কর্মী নিয়োগ ও অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি পর্যাপ্ত কাজের চাপ নিতে হবে। তাছাড়া প্রতিদিন রেস্টুরেন্টে উপস্থিত থেকে সকল কাজ পরিচালনা করতে হবে। আর এই উপস্থিতি রেস্টুরেন্ট চালুর অন্তত এক বছর অব্যাহত রাখতে হবে।

৫। বাস্তবতার নিরিখে রেস্টুরেন্ট কর্মীদের বেতন ভাতা নির্ধারন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে রেস্টরেন্টের প্রতিদিনের গড় বিক্রয়ের পরিমাণ বিবেচনায় রাখতে হবে।

৬। রেস্টুরেন্ট চালুর পূর্বে একটি বাজেট পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরী। অর্থাৎ জিনিসপত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন খাতে কত টাকা খরচ করবেন তার একটি যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যথাসম্ভব অযাচিত খরচ এড়িয়ে চলতে হবে। তাছাড়া প্রথম অন্তত তিন মাসের খাদ্য সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত মূলধন নিজের কাছে গচ্ছিত রাখতে হবে।

৭। গ্রাহক সেবার মান অত্যন্ত ভালো হতে হবে। যদি গ্রাহক পরিষেবার মান ভালো না হয় তবে গ্রাহকরা দ্বিতীয় বার আপনার রেস্টুরেন্টে যেতে আগ্রহী হবে না।

৮। পরিচিতির জন্য মার্কেটিং করতে হবে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন তৈরী, লিফলেট বিতরণ, অনলাইন বিজ্ঞাপন ইত্যাদি করা যেতে পারে। ফলে আপনার রেস্টুরেন্ট সম্পর্কে অনেক মানুষ জানতে পারবে।

৯। আপনার রেস্টুরেন্টে প্রতিদিন আনুমানিক কত জন মানুষের খাবার দরকার হয়, কোন আইটেম গুলো বেশী লাভজনক, আপনার রেস্টুরেন্টের কোন কোন খাবার গুলোর জনপ্রিয়তা বেশী এই বিষয়ে আপনার সুনির্র্দিষ্ট ধারণা থাকা জরুরী। এর ফলে অনাকাঙ্খিত অনেক সমস্যা এড়িয়ে যেতে পারবেন।

১০। রেস্টুরেন্টে মানুষ সাধারণত খাবার খাওয়ার জন্য আসে। এক্ষেত্রে খাবারের কোয়ালিটি ভালো না হলে গ্রাহকরা আপনার রেস্টুরেন্টে দ্বিতীয় বার আসতে আগ্রহী হবে না।

১১। রেস্টুরেন্টের মেন্যুর তালিকা দীর্ঘ করবেন না। এক্ষেত্রে কয়েকটি লাভজনক খাবার এক সাথে করে একটি সেট মেন্যু বানাতে পারেন।

১২। অফলাইনে মার্কেটিং এর পাশাপাশি সমান তালে অনলাইন মার্কেটিং এর কাজও চালিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো ব্যবহার করতে পারেন। এতে অধিক সংখ্যক মানুষ আপনার রেস্টুরেন্ট সম্পর্কে জানতে পারবে।