ব্যাংক বীমা শেয়ার বাজার

ব্যাংক বীমা শেয়ার বাজার

ব্যাংক বীমা শেয়ার বাজার

আমাদের দেশে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ খাতের মধ্যে ব্যাংক বীমা এবং শেয়ার বাজার অন্যতম। টাকা জমানো এবং তা বাড়ানোর জন্য এই তিনটি সেক্টর জোড়ালো ভূমিকা রাখে।

একজন সাধারন মানুষ হিসাবে আমাদের মধ্যে অনেকেই অনেক সময় দ্বিধাদণ্ডে পড়ে যাই যে আমরা কোন খাতে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ করব।

আসুন আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা এই ৩টি খাত সম্পর্কে কিছু ধারনা নেওয়ার চেষ্টা করি।

প্রথমেই আসি এই ৩টি সেক্টরের মধ্যে কোনটি সব থেকে বেশী জনপ্রিয়। এর উত্তর আমরা মোটামুটি সবাই জানি তা হচ্ছে ব্যাংক।

ব্যাংক সব থেকে জনপ্রিয়। বাংলাদেশে মোট তালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। শহর, জেলা শহর, উপজেলা সহ মফস্বলেও ব্যাংকিং কার্যক্রম পৌঁছে যাচ্ছে।

মানুষ খুব সহজেই ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছে। জনপ্রিয়তার দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বীমা কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ৭৯টি বীমা কোম্পানি বীমা সেবা দিচ্ছে যার মধ্যে ৩৩টি লাইফ বীমাকারী কোম্পানি এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমাকারী কোম্পানি।

জনপ্রিয়তার তৃতীয় অবস্থানে আছে শেয়ার বাজার। প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের বিও একাউন্ট আছে। এর মধ্যে বিনিয়োগকারীর সংখ্য হবে ৮/১০ লাখের মত।

আমরা যদি সাধারন মানুষের বিশ্বাস যোগ্যতা নিয়ে মূল্যায়ন করি তাহলে এখানেও ব্যাংক সবার আগে, এর পরে বীমা কোম্পানিগুলো এবং সবার শেষে আছে শেয়ার বাজার।

একজন সাধারন মানুষ যার ব্যাংক, বীমা ও শেয়ার বাজার নিয়ে কোন ধারনাই নেই তার পরও সে ব্যাংকে টাকা জমাবে কেননা ব্যাংক আমাদের দেশের পেক্ষাপটে অধিক নিরাপদ।

বীমা কোম্পানিগুলোও এখন যথেষ্ট ভালো করছে। যদিও কিছু কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নিউজে আসলেও দিন দিন এর সংখ্যা কমছে। আর আমাদের শেয়ার বাজার নিয়ে সাধারন মানুষের ধারনা

খুবই সীমিত, কেননা শেয়ার বাজার কি বা কিভাবে কাজ করে এই বিষয়গুলো তখনই শতভাগ বুঝতে পারা যায় যখন একজন মানুষ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে। কেননা বাজারে না আসা পর্যন্ত অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায় না।

আপনি যদি ব্যাংকে এককালীন টাকা রাখেন কিংবা DPS আকারে মাসে মাসে জমান তাহলে আপনার কাজ হবে ব্যাংকের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী টাকা দেওয়া।

আপনার টাকা নিয়ে তারা মাটি চাপা দিয়ে রাখুন, কিংবা অন্য কোথায় বিনিয়োগ করুন তা আপনার দেখার বিষয় না। আপনার কাজ হবে মেয়াদ শেষে টাকা বুঝে নেওয়া।

আপনি যদি বীমা বা insurance এ টাকা জমান হবে এখানেও ব্যাংকের মত মেয়াদ শেষ হলে কোম্পানি ঘোষিত বোনাস পাওয়া যায়। মুলত, বীমা বা  insurance মানে হচ্ছে একটি চুক্তি।

কোম্পানির সাথে বীমা গ্রহিতার মধ্যে যে চুক্তি হয় তাই insurance বা বীমা। এখানে অনেক “যদি এবং কিন্তু” বিষয় আছে। যেমন শিক্ষা বীমা পলিসিতে বীমা গ্রহীতা insurance এর মেয়াদ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে মেয়াদ শেষে টাকা পাবে, মারা গেলে তার নমীনী এবং যার নামে শিক্ষা বীমা করা হয়েছে সেই বাচ্চা টাকা পাবে, বীমা গ্রহীতার দুর্ঘটনা ঘটলে, কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে টাকা পাওয়া যায়।

অনেক সময় ক্ষেএ বিশেষ ব্যাংকের চেয়ে বীমা থেকে বেশি লাভবান হওয়া যেতে পারে। এবার আসি শেয়ার বাজারে। এত ক্ষন ব্যাংক ও বীমা নিয়ে যেই কথা বললাম তা হলো সঞ্চয়। শেয়ার বাজার টাকা খাটানো মানে বিনিয়োগ করা। এটি একটি ব্যবসা। এখানে লাভ ও লস দুই হতে পারে।

যেখানে আমার ব্যাংক ও বীমাতে মূলধন কমার সুযোগ থাকে না, শেয়ার বাজারে মূলধন কমার সুযোগ থাকে, একই সাথে দায়িত্ব নিয়ে বলছি দেশের যে কোন বিনিয়োগ খাতের থেকে এখান থেকেই বেশি লাভবান হওয়া যেতে পারে।

ব্যাংক ও বীমায় টাকা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ নেই, এখানে মেধা বা শ্রম দেওয়ার কোণ ক্ষেএ নেই। অন্যদিকে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকৃত টাকার পাশাপাশি মেধা, শ্রম দিতেই হবে।

সাধারন একজন মানুষ যখন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে তখন সে অনেক বেশী অধৈর্য্য হয়ে যায়।

ঐ একই ব্যক্তি কিন্তু ব্যাংকে ৫ বছর মেয়াদী DPS করেছে যা নিয়ে তিনি অধৈর্য্য হচ্ছে না, অধৈর্য্য হচ্ছে শেয়ার বাজার নিয়ে। এর প্রধান কারন হচ্ছে, ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার পর আপনার আর কোন কাজ নেই, কেননা আপনি যেই টাকা জমা দিয়েছেন তা দেখতেও পাবেন না।

আর শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ যা হয় তা হলো, সব সময়, সারাক্ষন আপনি দেখতে পাচ্ছেন, আপনি লাভে আছেন না লসে। শেয়ার বাজারে যেহেতু কেনা/বেচা করা সহজ, চাইলে দেখা যায়, মুল্যায়ন করা যায় ইত্যাদি কারনে শেয়ার বাজারে বেশীর ভাগ মানুষ অধৈর্য্য হয়ে যায়।

এর পর আসি তারল্য নিয়ে। ব্যাংক বীমা ও শেয়ার বাজার এর মধ্যে সবচেয়ে তারল্য কম বীমাতে। কেননা বীমা করা হয় একটি নিদিষ্ট সময়ের জন্য। এর আগে সেই জমাকৃত টাকা তোলা যায় তবে কোম্পানি ভেদে নানা রকম নিয়ম নীতি আছে।

শেয়ার বাজারে সাধারনত ৩/৪ দিনের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করে টাকা ক্যাশ করা যায় এবং ব্যাংকেও শর্তমতে কম সময়ের মধ্যে টাকা ক্যাশ করা যায়।

এখন আসি লাভের বিচারে। যেহেতু আমরা আগেই জেনেছি ব্যাংক ও বীমা খাতে টাকা রাখা বিনিয়োগ না সঞ্চয়। তাই এখানে লাভের পরিমানও সীমিত।

বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির কারনে ব্যাংকে টাকা রাখা মানে অনেক সময় লাভের বদলে লস করা। আপনি যদি ৫ লাখ টাকা ১ বছরে মেয়াদের জন্য ব্যাংকে রাখেন তবে আপনি আনুমানিক ২৫,০০০ টাকা সুদ পাবেন।

এই টাকার মধ্যে ১০ থেকে ১৫% সরকারকে ভ্যাট দিতে হবে, এছাড়া ব্যাংকের কিছু সার্ভিস চাজ তো আছেই। বছর শেষে আপনার যেই টাকা টিকবে তার থেকে মুদ্রাস্ফীতি বেশী।

অন্যদিকে, বীমায় লাভ তুলনামূলক আরো কম, তবে বীমা যে সকল সুবিধা দেয় তা ব্যাংকে পাওয়া যায় না। যেমন চিকিৎসা খরচ, শিক্ষা খরচ, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি।

ব্যাংক, বীমা ও শেয়ার বাজারের মধ্যে বেশি লাভের সম্ভাবনা শেয়ার বাজারে। শেয়ার বাজারে একদিনে একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ১০% পর্যন্ত বাড়তে পারে।

যা ব্যাংক বা বীমায় এক বছরেরও পাওয়া যায় না। একই ভাবে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করলে, শেয়ার বাজারে ঝুঁকি বেশী অন্য ২ সেক্টরের চেয়ে। তবে ঝুঁকি কমানোর কিছু কৌশল জানা থাকলে ঝুঁকি মোকাবেলার মাধ্যমে শেয়ার বাজার থেকে অধিক লাভ করা যেতে পারে।

এবার আসুন জানি কত দিন কোন খাতে বিনিয়োগ করা উচিত?

টাকা জমানো বা বিনিয়োগ যাই করেন না কেন তা দীর্ঘ মেয়াদী হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে এই ৩টি সেক্টরের মধ্যে ব্যাংকে কম সময়ের জন্য বিনিয়োগ করা যায়। এটা হতে পারে ৩মাস/ ৬মাস /৯মাস কিংবা ১ বছর বা আরো বেশী। insurance বা বীমায় যত বেশী বেশী সময়ের জন্য করা যায় ততই ভালো।

এখানেও ব্যাংকের মত DPS করা যায় তবে এই insurance এ DPS এর থেকে জীবন বীমা, শিক্ষা বীমা, পেনশন স্ক্রীম করা উত্তম। আর শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ হতে হবে  দীর্ঘ মেয়াদী যা কম পক্ষে ১ বছর।

আরো পড়ুন-

এখানে বিনিয়োগের পূর্বে আপনাকে অবশ্যই একটি পরিকল্পনা করতে হবে। আপনি শুনে থাকবেন অনেকেই শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে টাকা লস করেছে, বা এখনও করছে, এর পিছনে অনেক কারন থাকতে পারে, তবে প্রধান কারন হচ্ছে পরিকল্পনা না করে বিনিয়োগ করা।

যেহেতু এখান থেকে অধিক লাভ করা যায় তাই আপনাকে অবশ্যই এই লাভের জন্য পরিশ্রমও করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, এই ৩টি সেন্টরের মধ্যে ব্যাংক বীমাতে মেধা ও পরিশ্রম খাটানোর কোন সুযোগ নেই, এবং মোটামুটি নিরাপদ সঞ্চয় মাধ্যম।

শেয়ার বাজারে রিস্ক আছে একই সাথে লাভের পরিমানও বেশ ভালো। ব্যাংক ও শেয়ার বাজারে তারল্য বেশি, বীমাতে কম। ব্যাংকে টাকা রাখার পরে সুদের উপর ট্যাক্স দিতে হয়, যা বীমা ও শেয়ার বাজারে নেই। ভিজিট করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল – Bangla Preneur YouTube Channel