পেশা হিসেবে ফিজিওথেরাপি কেমন

ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার 

পেশা হিসেবে ফিজিওথেরাপি কেমন

পেশা হিসেবে ফিজিওথেরাপি কেমন

স্বাস্থ্য হল শরীর, মন এবং আত্মার সমন্বিত সুস্থতা। একটা স্বাস্থ্যকর জীবন একটা সমৃদ্ধ জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ হয়ে পড়লে সুস্থতা ফিরে পেতে আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগরায়ন, পরিবেশ দূষণ ও ভেজাল খাদ্যাভ্যাসের কারণে আমাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যখাতে সেবার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তাই ক্যারিয়ার হিসেবে অনেকেরই প্রথম পছন্দে থাকে ডাক্তার, নার্স, ডেন্টিস্ট বা ফিজিওথেরাপিস্ট হওয়া।

আধুনিক বিশ্বের সাথে সাথে বাংলাদেশেও পেশা হিসেবে দিন দিন ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব ও চাহিদা বাড়ছে। ক্যারিয়ার অপশন হিসেবে ফিজিওথেরাপি কেমন হতে পারে, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

ফিজিওথেরাপি আসলে কি?

অনেকের কাছেই ফিজিওথেরাপি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা নেই। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি শাখা যা শরীরের বিভিন্ন স্নায়ুতন্ত্র, পেশীতন্ত্র, কঙ্কালতন্ত্র সম্পর্কিত বিভিন্ন কন্ডিশন, পেইন ইত্যাদির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সাহায্য করে।

এটি একটি স্বতন্ত্র চিকিৎসা ব্যবস্থা যেখানে একজন ফিজিওথেরাপিষ্ট রোগীর সাথে কনসালটেন্সি ও বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করেন, একটি চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন, এবং বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট ডিভাইস ও ম্যানুয়াল টেকনিক ব্যাবহার করে রোগীকে ট্রমা, পেইন, অক্ষমতা থেকে সারিয়ে তুলে পুনর্বাসনে সহায়তা করেন।

কি কারণে ক্যারিয়ার হিসেবে ফিজিওথেরাপি বেঁছে নিবেন?

আমাদের দেশে একসময় ফিজিওথেরাপি ডিপ্লোমা ডিগ্রি নির্ভর ছিল। ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিষ্টরা বেশিরভাগক্ষেত্রেই Electrotherapy ইলেক্ট্রোথেরাপির(বিভিন্ন চিকিৎসা ডিভাইস) উপর নির্ভরশীল ছিল।

তখন তাত্ত্বিক শিক্ষাকে খুব বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। কিন্তু উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে এবং স্বাস্থ্য খাতে ফিজিওথেরাপিস্টের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে সাথে ফিজিওথেরাপি পেশাটি পুনরায় ঢেলে সাজানো হয়েছে।

সকল হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি বিভাগ চালু হয়েছে। পেশাজীবী হিসেবে ফ্রেশারদের জন্য এখানে যথেষ্ট কাজের সুযোগ আছে।

ফিজিওথেরাপি নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার আকর্ষণীয় দিকগুলো

#১। প্রথমত দেশে বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর খুব কমসংখ্যক ফিজিওথেরাপিস্ট বের হয়। ফলে স্বাস্থ্যখাতে এই পেশার জনবল প্রয়োজন।

#২। পেশীর ব্যথা, স্নায়বিক ব্যাধি, পেশী ও কঙ্কালজনিত অক্ষমতা, পক্ষাঘাত, হাড় ভেঙ্গে যাওয়া, অটিজম, এবং আঘাত নিরাময় ও পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য। দিন দিন মানুষের এসব সমস্যায় আক্রান্ত হবার পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ফিজিওথেরাপিষ্টের চাহিদা।

#৩। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশের স্বপ্ন থাকে মেডিকেল সেক্টরে কাজ করার। কিন্তু সরকারিভাবে এমবিবিএস কোর্সে চান্স পাওয়া বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ।

বেসরকারিভাবে পড়তে গেলেও অনেক আর্থিক সচ্ছলতার প্রয়োজন পড়ে। সে হিসেবে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ফিজিওথেরাপি নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ।

#৪। সদ্য পাশ করা গ্র্যাজুয়েটদের জন্য কাজের সুযোগ রয়েছে, যেখানে এটি অন্য পেশাগুলোর ক্ষেত্রে বেশ চ্যালেঞ্জইং।

#৫। বিভিন্ন স্পোর্টস ক্লাবে ফিটনেস পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রচুর ফিজিও কাজ করছেন।

#৬। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে ফিজিওথেরাপিষ্টদের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। কেউ বিদেশে সেটেল হতে চাইলে এই পেশা আপনাকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে।

#৭। ব্যাক্তিগত প্র্যাকটিসের সুযোগ রয়েছে। হসপিটালের পাশাপাশি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বা চেম্বারে প্র্যাকটিস করা যায়।

#৮। সরকারিভাবে স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের অধীনে বিভিন্ন নতুন নতুন পদ সৃষ্টি হচ্ছে।

ফিজিওথেরাপি কোর্স কারিকুলাম, সময়কাল, এবং কি কি পড়ানো হয়?

ফিজিওথেরাপি নিয়ে পড়ার জন্য বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউণ্ড থাকতে হয়। বাংলাদেশে কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে এসএসসির পর সাধারণত তিন বছরের ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপি(ডিপিটি) কোর্স পড়ানো হয়। তাদের ছয় মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ থাকতে হয়। তারা সাধারণত ফিজিওথেরাপি টেকনিশিয়ান হিসেবে পরিচিত। তাদের কাজ হল একজন পেশাদার ফিজিওথেরাপিস্টকে চিকিৎসায় সহায়তা করা।

বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি বা বিপিটি কোর্সের সময়কাল পাঁচ বছর, যেখানে চার বছর চারটি পেশাগত পরীক্ষার পর এক বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ করতে হয়। ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্টদের বিএসসি করার সুযোগ রয়েছে।

অন্য মেডিকেল সাবজেক্টগুলোর মতোই এখানে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, কমিউনিটি মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি ইত্যাদির পাশাপাশি সাইকোলজি, অর্থোপেডিক মেডিসিন, থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, কাইনেসিওলজি ইত্যাদি বিষয়গুলো পড়ানো হয়।

ফিজিওথেরাপিতে মাস্টার্স কোর্সের সময়কাল সাধারণত দুই বছর।

ফিজিওথেরাপি কোথায় পড়বেন?

বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদের অধীনে বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যবিজ্ঞান কলেজ রয়েছে যেখানে ফিজিওথেরাপির গ্রাজুয়েশন কোর্স পড়ানো হয়।

সবকটি কলেজে একই কোর্স কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। সাধারণত দুইটি সেশনে এসব কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ আছে। এছাড়াও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওথেরাপি নিয়ে পড়া যায়।

ফিজিওথেরাপি পেশার গুরুত্ব

একজন মানুষের যখন শরীরের কোন হাড় ভেঙ্গে যায়, একজন সার্জন সেটিকে জুড়ে দিয়ে প্লাস্টার করে দেন।

কিন্তু সার্জারির পর ভাঙ্গা অঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পেশিগত ও স্নায়ুগত জটিলতা দেখা দেয়।

ভাঙ্গা স্থান ফুলে যায় অথবা পেশির ক্ষয় হয়। পেশীর স্বাভাবিক বিন্যাস নষ্ট হয়। জয়েন্টে পেইন হয় অথবা পূর্ণ মাত্রার সঞ্চালন ব্যাহত হয়ে পড়ে।

অনেক দুর্বলতা দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে রোগীর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব একজন ফিজিওথেরাপিস্টের।

একইভাবে একজন স্ট্রোক রোগীর কোন অংশ প্যারালাইসিস হয়ে গেলে, মেরুদণ্ডে কোন সমস্যার জন্য স্নায়ু সঞ্চালন ব্যাহত হলে, বিভিন্ন খেলাধুলাজনিত ইনজুরি, স্প্রেইন, জয়েন্ট ডিসলোকেশন, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া, টেন্ডন ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া, পেশীর দুর্বলতা, বিভিন্ন ধরনের পালসি, ঘাড়ে, অথবা ব্যাক পেইন ইত্যাদি অসংখ্য কন্ডিশনে ফিজিওথেরাপি সবচেয়ে কার্যকর।

ক্রীড়া ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টের চাহিদা বাড়ছে। আগে তাদের চাহিদা বেশিরভাগ ক্রিকেট ও ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন টেবিল টেনিস, লং টেনিস, বিলিয়ার্ডস, সাঁতার ইত্যাদিতে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট।

মাস্টার্স ডিগ্রি পাওয়ার পরে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট শিক্ষকতাও বেছে নিতে পারেন। অথবা পিএইচডি করে বিভিন্ন গবেষণায় যুক্ত হতে পারেন। 

আরোও পড়ুন – যেকোন ক্যারিয়ারে দরকারি ৮টি সাধারণ দক্ষতা

পরিশেষে

বাস্তবিক অর্থে একবিংশ শতাব্দীর আগে আমাদের দেশে পেশা ও চিকিৎসা ব্যাবস্থা হিসেবে ফিজিওথেরাপি ততটা পরিচিত ছিল না।

কিন্তু ক্রমেই ফিজিওথেরাপির জনপ্রিয়তা ও ফিজিওথেরাপিস্টদের কাজ করার ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে।

প্রান্তিক পর্যায়ে ততোটা বিস্তৃত না হলেও, শহর কিংবা মফস্বলের যেকোনো হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি বিভাগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আবার চেম্বার কিংবা রোগীর বাসায় প্র্যাকটিস করছেন।

ইউরোপে আয়ের দিক দিয়ে একজন ফিজিওথেরাপিষ্ট প্রথম সারির পেশাজীবী। আমাদের দেশের একজন ফিজিওথেরাপিস্টের আয় বহিঃবিশ্বের তুলনায় যথেষ্ট কম হলেও দিনে দিনে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হচ্ছে।

তাই বর্তমানে এটি অন্যতম উদীয়মান পেশা। একজন দক্ষ পেশাদার হিসেবে নিজেকে তৈরি করে নিতে পারলে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার এককথায় অসাধারণ।