টাকা ধরে রাখার ৭ টি উপায়

টাকা ধরে রাখার ৭ টি উপায়

টাকা ধরে রাখার ৭ টি উপায়

টাকা আমরা মোটামুটি কম-বেশি সবাই আয় করি। কেউ কম টাকা করি, আর কেউ তুলনামূলক বেশি টাকা আয় করি। তবে লক্ষ্য করে দেখবেন, কেউ অনেক টাকা আয় করেও ধরে রাখতে পারছে না।

আবার কেউ কেউ কম টাকা আয় করেও সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করছে এবং টাকা সঞ্চয়ও করছে। আচ্ছা এই মানুষগুলি কি ম্যাজিক জানে? কোন এক জাদুমন্ত্র বলে এদের টাকা খরচ হয় না? বিষয়টি কি এমন?

মোটেই না, আধুনিক এই যুগে এসে আমরা এই কথা আর ভাবতে পারি না। আমি এমন বেশ কয়েকজন মানুষকে জানি যারা বেশ ভাল টাকা আয় করার পরও মাসের শেষে বেশ টানাটানিতে থাকে। এমনকি তার অধিনস্ত অপেক্ষাকৃত কম টাকা আয় করে এমন মানুষের কাছে ধার করে।

অবশ্যই তারা টাকা সঠিক সময়ে ফেরত দেয়, কিন্তু আমাকে যদি প্রতিনিয়ত নিত্যদিনের জীবন-যাপনের জন্য ধার বা ঋণ নিতে হয় তবে আমার জেনে রাখা উচিত আমি সঠিক পথে নেই। আমাদের ইনকামের তুলনায় ব্যয় সব সময়ে বেশি থাকে।

‘চাহিদা প্রচুর, যোগান অল্প’ কথাটির সাথে আমরা পরিচিত সকলেই। আপনার ব্যয় বেশি হলে আয় বৃদ্ধির দিকে চিন্তা করা আবশ্যক। কিন্তু ঋণ নিয়ে আপনি আর যাই হোক বেশি ভাল ভাবে চলতে পারবেন না। প্রতি মাসেই যদি আপনাকে ঋণ নিতে হয় তবে এখনই সাবধান হওয়া জরুরী। আবার ফিরে আসি পুরানো কথায়।

কিছু মানুষ তাদের হাতে টাকা ধরে রাখতে পারে, কিছু মানুষ এই টাকা ধরে রাখতে পারে না। টাকা ধরে রাখা একটি ব্যবস্থাপনা।

কেউ সারা জীবনেও সেটি ধরে রাখতে পারে না, কেউ অল্প বয়সেই মানি ম্যানেজমেন্টে দক্ষ হয়ে ওঠে।

আপনি কোনটি করবেন সেটি আপনার বিষয়। আজ টাকা ধরে রাখার ৭টি অসাধারণ উপায় নিয়ে আমরা কথা বলব।

১। খরচের হিসাব রাখুন

মনে মনে খরচের হিসাব রাখবেন না। নিজের উন্নতির জন্য জীবনে এত কষ্ট করছেন। এবার আর একটু কষ্ট করুন। খরচের হিসাব রাখুন এবং সেটা খাতা কলমে কিংবা কম্পিউটারে এক্সেল শিটে।

যদি আপনি সেভিংসে একেবারে নতুন হন এবং নতুন আয় করছেন এমন হয় তবে আপনার সম্ভাব্য খরচের একটি লিস্ট করতে পারেন।

রিক্সা ভাড়া হোক, চায়ের দোকানের ৫ টাকা বিল হোক, অথবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার মুহূর্ত হোক, সব খরচের হিসাব রাখুন। প্রতিটি খরচের হিসাব রাখলে আপনি মাস শেষে বুঝতে পারবেন কোথায় আপনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করছেন, কোথায় খরচ কমনো দরকার।

আমোদ, হাসি, আনন্দ, মজা এগুলো জীবনের একটি অংশ। আপনি এটাকেই নিশ্চয় জীবন বানিয়ে ফেলতে চান না। প্রতিদিন রেস্টুরেন্ট খাওয়ার মধ্যে বিলাসিতা থাকতে পারে, প্রকৃতপক্ষে এর কিন্তু কোন লাভ নেই।

২। সঞ্চয়ের জন্য বাজেট করুন

সঞ্চয় ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে সঞ্চয়ের বেসিক কিছু নিয়ম সবার জন্যই ভাল। আয়ের থেকে সঞ্চয় বিয়োগ দেওয়ার পর যা থাকবে তাই হবে আমার ব্যয়। এই ফর্মূলা ব্যবহার করলে নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরী হবে। আবার ৫০/৩০/২০ রুলস্ বেশ কার্যকরী।

আপনার আয়ের ৫০% আপনি বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বা বিলের জন্য যেমন- খাবার, ইলেকট্রিক বিল এ খরচ করবেন।

৩০% আপনি আপনার ব্যক্তিগত কিংবা নিজস্ব খরচের জন্য ব্যবহার করবেন যেন, ব্যাগ, জামা কাপড়, ঘোরাঘুরি ইত্যাদি। ২০% টাকা আপনি সরাসরি সেভিংস বা সঞ্চয় করবেন। প্রতিমাসে যদি নিজের আয়ের ২০% সেভ করতে পারেন তবে বছর শেষে বেশ অনেক টাকা আপনার হাতে থাকার কথা।

আর একটি বিষয় অবশ্যই মেনে চলতে হবে, সঞ্চয়ের টাকা উত্তোলন করা যাবে না। অনেকে সঞ্চয়ের কয়েক মাস পরেই টাকা তুলে কিছু একটা কিনে ফেলে। এমন করলে বড় অঙ্কের টাকা জমানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

৩। খরচ কমানোর চেষ্টা করুন

খরচ কমানোর কথা বললে অনেককে বলেন না খেয়ে থাকবো নাকি? নানা খেয়ে থাকতে কেউ বলে নি আপনাকে। সবারই কিছু বাড়তি খরচ হয়।

যে মানুষটি বলেন আমার কোন নেশা নেই সে হয়তো অন্য কোন কাজে অতিরিক্ত টাকা খরচ করছেন। আপনি হয়তো সিগারেট খান না, পান খান না।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর পর চায়ের দোকানে যেয়ে বসেন। এবং চায়ের তৃষ্ণা না পেলেও অভ্যাসবশত চায়ের অর্ডার দেন। এখন চিন্তা করুন, প্রতিদিন যদি গড়ে আপনি অপ্রয়োজনে ৩ কাপ চা খান তবে মাসে আপনি অকারণে ৪৫০ টাকা অযথা খরচ করেন।

চায়ের দোকানে মানুষ একা বসে থাকে না, বন্ধুবান্ধব, পরিচিত জনের আড্ডা চলে। সুতরাং আপনি এই ৪৫০ টাকার বেশি অযথা প্রতিমাসে খরচ করেন।

এমন বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খরচের হিসাব আপনি পেয়ে যাবেন যদি আপনি খরচের হিসাব রাখা শুরু করেন। আর সেখান থেকেই খরচ কমিয়ে আনার বিষয়টি সম্পর্কে আপনার ধারণা স্পষ্ট হবে।

৪। সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন

সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ভুলবেন না। লক্ষ্যহীন সঞ্চয় তেমন ভাল ফলাফল নিয়ে আসে না। লক্ষ্য স্থির করুন ১ বছরে আপনি কত টাকা জমাবেন। কিংবা জমানো টাকা দিয়ে কি করবেন ভবিষ্যতে।

নিজের মধ্যেই একটি আশার সঞ্চয় করুন, স্বপ্ন দেখান নিজেকে। আজ আপনার এই ত্যাগস্বীকার ভবিষ্যতে আপনাকে কি দিবে সেটি কল্পনা করলে সঞ্চয়ের মনমানসিকতা বজায় থাকবে।

৫। আপনার জন্য কি গুরুত্বপূর্ণ ভেবে দেখুন

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আলাদা আলাদা লক্ষ্য আছে। আপনার জীবনে লক্ষ্য অনুসারে আপনাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আয় কখনোই সমান থাকে না। বৃদ্ধিও হতে পারে, আমার কমতের পারে।

আর তাই প্রস্তুত থাকা ভাল। রিটায়মেন্ট প্ল্যান চাকুরীজীবিদের জন্য একটি ভাল সিদ্ধান্ত। চাকুরীতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর আপনি কর্মক্ষম হলেও থাকতে পারবেন না। আর তাই আগাম প্রস্তুতি আবশ্যক।

আরোও পড়ুন – অধিক টাকা আয় করার জন্য কিভাবে নিজেকে মোটিভেট রাখা যায়

৬। অটোমেটিক সঞ্চয় করুন

ব্যাংক থেকে লোন নিলে অনেকে স্যালারি একাউন্টের সাথে এ্যাডজাস্ট করে দেয়, এবং মাসের একটি নির্দিষ্ট টাইমে স্যালারি একাউন্ট থেকে সরাসরি টাকা কেটে নেয়। সেভিংসের জন্য আপনি এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।

আপনার স্যালারি ঢোকার সম্ভাব্য ২/৩ দিন পর আপনার একাউন্ট থেকে টাকা সরাসরি সেভিংস একাউন্ট বা অন্য কোন খাতে চলে যাবে এমন করতে পারেন।

৭। নিজের সঞ্চয়ের গড়ে ওঠা দেখতে ভুলবেন না

এটা সত্যিই কঠিন যে, আপনি মাসের পর মাস টাকা জমাছেন কিন্তু কিছুই দেখতে পারছেন না। এতে কিছুদিন পর সঞ্চয়ের আগ্রহও কমে আসে।

এক্ষেত্রে প্রতিমাসে নিজের সঞ্চয়ের হিসাব রাখুন, এবং নিজেকে উৎসাহ দিন যে আপনি পেরেছেন। এতে করে সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির সাথে সাথে আপনার পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণ সহজ এবং অর্থপূর্ণ হবে।

এমন অনেক মানুষ আছে যারা সারাজীবন অনেক পরিশ্রম করে টাকা উপার্জন করেছেন, বেশ ভাল টাকাই আয় করেছেন।

কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে কষ্টকর জীবন যাপন করছে। বৃদ্ধ বয়সে চাকুরী খুঁজছে এমন নজির অনেক। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছে। একটু খোঁজ করলেই আপনি খুঁজে পাবেন।

আপনি কত টাকা ধরে রাখতে পারবেন সেটি নির্ভর করে আপনি কত ভাল ভাবে মানি ম্যানেজমেন্ট করতে পারেন তার উপর। শেষ বয়সে আফসোস না করার চেয়ে বরং সময় থাকতে সর্তক হওয়া বেশি ভাল।

টাকা ধরে রাখার জন্য আপনাকে মেধার প্রয়োগ করতে হবে, ইচ্ছাশক্তির সাথে সাথে কৌশলী হয়ে উঠতে হবে। এই বিষয়ে আপনাকে অনেকে পরামর্শ দিবে সে কথা সত্য, কিন্তু আপনার সঞ্চয়ের পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন একমাত্র আপনি।