অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে চান? এড়িয়ে চলুন উপস্থাপনায় করা এই ৮টি ভুল

এড়িয়ে চলুন উপস্থাপনায় করা এই ৮টি ভুল

অনুষ্ঠান উপস্থাপনা

উপস্থাপনা কৌশল এবং উপস্থাপনা করার নিয়ম নিয়েই আজকের আমাদের এই আয়োজন। চলুন শুরু করি…

একটি অনুষ্ঠানের সবচেয়ে দায়িত্ববান এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন উপস্থাপক। উপস্থাপক এমনই এক ব্যক্তি, যার উপর অনুষ্ঠানের অনেকটাই সফলতার নির্ভর করছে। অনুষ্ঠানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্টেজের উপর একছত্র অধিকার, আর তাই দায়-দায়িত্বও বেশি। উপস্থাপনা একটি স্বতঃস্ফুর্ত গুন, কিছু বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি সেই গুণের অধিকারী।

আমাদের দেশে অনেকেই ঘোষক এবং উপস্থাপককে এক মনে করেন। কিন্তু এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। ঘোষক যেখানে শুধু নাম ঘোষনা করেন, অপর দিকে একজন উপস্থাপক অনুষ্ঠানের রূপ দান করেন।

নিজের সজীবতা, জ্ঞান, রসবোধ, প্রতিভা এবং কল্পনাশক্তি প্রভৃতি গুন দ্বারা উপস্থিত সকলের আকর্ষন ধরে রাখা এবং অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য। সময়ের আবর্তনে উপস্থাপককে বিভিন্ন নামে এখন ডাকা হয়। যেমন, অ্যাংকর, কম্পেয়ার, হোস্ট, প্রেজান্টার, ইত্যাদি।

একজন উপস্থাপক একদিনে ভাল উপস্থাপক তৈরী হয় না। তবে ভাল উপস্থাপক হতে চাইলে, তার ভিতরে কিছু গুণ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন, আমরা সবাই ২/৫ লাইন নিজের মতো করে লিখতে পারি। কিন্তু আমরা সবাই লেখক নই। লেখকের অবশ্যই কিছু গুণাবলি আছে।

বর্তমানে উপস্থাপনা শেখানোর জন্য বিভিন্ন একাডেমি কাজ করছে, কিন্তু সকলের পক্ষে কোর্স করা সম্ভব নয়। ভাল উপস্থাপনার কৌশল নিয়ে আমাদের আরো একটি লেখা আছে। তবে আজ আমরা আলোচনা করবো উপস্থাপনায় কিছ ভুলের বিষয়ে।

১। নিয়মিত প্র্যাকটিস বা অনুশীলন না করা

Practice makes perfect.  ছোটবেলায় বহুবার শোনা এই কথাটি আমরা প্রায়ই ভুলে যায়। কোন বিষয়ে আপনার দক্ষতা অর্জনের জন্য অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই। আপনার যত সুন্দর হাতের লেখাই হোক না কেন, আপনি যদি ২ মাস একনাগাড়ে না লিখেন, তবে ২ মাস পর আপনার আগের হাতের লেখার সাথে বর্তমান লেখার পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে।

এসময় আপনি লক্ষ্য করবেন যে, আপনি আর আগের সেই সৌন্দর্য্য খুঁজে পাচ্ছেন না। দীর্ঘ দিনের অনভ্যাসে আপনি হারিয়ে ফেলবেন আপনার দক্ষতা।

একজন গায়ককে যেমন স্টেজে গান করার পূর্বে সারা বছর জুড়ে অনুশীলন করতে হয়, নৃত্য শিল্পীকেও অনুশীলন করতে হয়।

একজন ভাল উপস্থাপককেও অনুশীলন করতে হয়। নিয়মিত অনুশীলন করলে আপনি নিজের অনেক ভুল ত্রুটি লক্ষ্য করবেন এবং সেগুলোর উপর কাজ করতে পারবেন। আবার কোন কথা আরো কত সুন্দর ভাবে বলা যায় সেই বিষয়েও চিন্তা করার সুযোগ পাবেন।

উপস্থাপনা করার জন্য আপনি আয়নার ব্যবহার করতে পারেন। কোন কথা, কিভাবে বলছেন সেবিষয়ে লক্ষ্য করুন। যেকোন বিষয়ে অর্নগল কথা বলার অনুশীলন করে নিজের দক্ষতা অর্জন করুন।

২। সঠিক ড্রেস কোড নির্বাচন না করা

অনুষ্ঠানের ধরন অনুসারে উপস্থাপকের ড্রেস কোড ঠিক করা উচিত। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কিংবা ইনফর্মাল অনুষ্ঠানে আপনি এক ধরনের পোশাক পড়তে পারেন, কোন ফর্মাল বা কর্পোরেট অনুষ্ঠানের আপনার পোশাক হবে ভিন্ন।

আপনি যদি ফর্মাল অনুষ্ঠানে ইনফর্মাল ড্রেস পড়েন এবং ইনফর্মাল অনুষ্ঠান ফর্মাল ড্রেস পড়েন তবে আপনি কখনোই কোন অনুষ্ঠানে নিজেকে দর্শকের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তুলতে পারবেন না।

আর তাই একজন ভাল উপস্থাপক হতে চাইলে ড্রেসের প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠা প্রয়োজন।

৩। অকৃত্রিমতা এবং নিজেকে ভুলে যাওয়া

একজন উপস্থাপকের কাজ হল, শ্রোতা বা দর্শকের হৃদয়ে প্রবেশ করা। অনুষ্ঠানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকের কাছে আসার সবচেয়ে বেশি সময় পান একমাত্র উপস্থাপক। সুতরাং সেই সময়টাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে।

আপনাকে জানতে হবে শ্রোতা কি জানতে চায়। আবার ঠিক তেমনি নিজেকে ভুলে যেয়ে আপনি যা নন, তেমন হওয়ার চেষ্টা না করাই ভাল।

কারন এতে আপনি যেমন নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন, ঠিক তেমনি দর্শকের আস্থাও অর্জন করতে পারবেন না।

সুতরাং আপনার নিজস্ব বেশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা যাবে না। স্কিপ্ট যিনিই লিখুন না কেন, আপনাকে নিজের মতো করে ভাবতে হবে।

কোন কথাটি আপনার সাথে যায়, কোন কথাটি আপনার সাথে যায় না সেটি ভাবুন। আপনি যেমন, তেমন ভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করলে সহজেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হবেন।

আপনার জন্য – ভয় পেয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার আগে ভাবুন ভয়ের পরেই কিন্তু জয়! 

৪। দীর্ঘ সময় নেওয়া

উপস্থাপক হিসাবে কাজ ভাল করতে চাইলে আপনাকে বুঝতে হবে, উপস্থাপকের দায়িত্ব বা কর্তব্য কি? আপনি একটি অনুষ্ঠানের হোস্ট, সুতরাং আপনি নিজেই যদি অনেক সময় নেন কথা বলার জন্য, তাহলে বক্তা কি বলবেন?

অনেকেই উপস্থাপনায় কথার মাধুর্য্য মেশানোর জন্য উপস্থাপক হিসাবে অনেক সময় নেন এবং বিরক্তির কারন হয়ে উঠেন। বক্তার পরিচয় দিতেও অনেকে সুদূর অতীতের গল্প বলে থাকেন। এতে সময় নষ্টের সাথে সাথে দর্শকদের চোখে আপনি আপনার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। আর তাই সর্তক হন।

আপনি কম কথায় কিন্তু আকর্ষনীয় ভাবে কি করে মূল বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন, একজন উপস্থাপক হিসাবে এটি আপনার বিশেষ গুন।

৫। শ্রোতা সম্পর্কে না জানা

উপস্থাপনার আগে আপনাকে অবশ্যই শ্রোতা সম্পর্কে জানতে হবে। একটি অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষন কিন্তু শ্রোতা। মূলত তাদের কেন্দ্র করেই একটি অনুষ্ঠান সাজানো হয়।

সুতরাং ভাল উপস্থাপক হতে চাইলে প্রতিটি অনুষ্ঠানের দর্শক বা শ্রোতা সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করুন। তাদের বয়স, রুচি, শিক্ষা, চাহিদাসম্পর্কে জানুন।

শিশুদের চাহিদা যেমন এক রকম থাকে, বড়দেরও চাহিদাও থাকে ভিন্ন। আবার স্কুলের শিক্ষার্থীদের চাহিদা যদি একরকম থাকে, কলেজের শিক্ষার্থীদের চাহিদা আবার ভিন্ন।

উপস্থাপক হিসাবে নিজেকে আকর্ষনীয় রূপে তুলে ধরতে চাইলে সবসময় মনে রাখতে হবে, আপনার শ্রোতা যেমন ভিন্ন ভিন্ন, তাদের চাহিদা এবং রচিও বিভিন্ন।

আপনি যদি কোন নতুন অঞ্চলে যান, তবে চেষ্টা করতে পারেন সেই অঞ্চলের প্রথাগত নিয়মে বা ভাষায় শুভেচ্ছা দিতে। আপনি যদি একটি লাইনও তাদের ভাষায় বলতে পারেন, তবে একমূহুর্তেই আপনি তাদের হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন। আরো পড়ুন – কথার মাধ্যমে মন জয় করুন

৬। ভুল তথ্য দিবেন না

উপস্থাপকের সকল কথাই শ্রোতা বিশ্বাস করেন এবং কমবেশি তার প্রয়োজন অনুসারে স্মৃতিতে সংরক্ষন করেন।

সুতরাং আপনি একটি ভুল তথ্য দিলে, আপনার শ্রোতাও ভুল তথ্যটিই সংরক্ষন করবে। সুতরাং নিজে যাচাই বাছাই করে তথ্য প্রদান করবেন।

আপনার নিজস্ব কোন উপলদ্ধি থাকলে, সেই বিষয়ে উল্লেখ করুন যে এটি আপনার নিজস্ব ধারনা।, কিংবা আপনি বিষয়টি এমনভাবে দেখছেন। ভুল তথ্য দিয়ে উপস্থাপনা করা নীতি বর্হিভ’ত এবং একই সাথে আপনার জন্য সম্মান হানিকর।

৭। ইংরেজি এবং বাংলার সংমিশ্রন

আপনি উপস্থাপক হিসাবে যেকোন একটি ভাষা বেছে নিন। বাংলা হলে বাংলা, ইংরেজি হলে ইংরেজি। তবে এই দুই ভাষার সংমিশ্রন ঘটাবেন না।

সহজ স্বাভাবিক শব্দ খুঁজুন। ভাষার প্রতি আপনার দক্ষতা দর্শকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়, বরং আপনি কি বলতে চেয়েছেন তা দর্শক বুঝতে পারলে, সেখানেই আপনার সার্থকতা।

৮। উত্তেজিত হওয়া

একজন উপস্থাপক হিসাবে আপনাকে সবসময়ই শান্ত থাকতে হবে।

আপনার সাথে অন্যের চিন্তা ভাবনা না মিলতেই পারে, কিন্তু আপনি আপনার দায়িত্বকে ভুলে যেতে পারেন না।

উপস্থাপক হিসাবে আপনার দায়িত্ব হল অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে পরিচালনা করা।

আপনি যদি উত্তেজিত হয়ে পড়েন, তবে সেটি সম্ভব নয়। সুতরাং কোন ভাবেই উত্তেজিত হওয়া যাবে না।

মঞ্চের পিছনে যতজন লোকই কাজ করুক না কেন, উপস্থাপকই  একজন মানুষ যিনি সম্পূর্ন টিমের কাজটি দর্শকরে সামনে তুলে ধরেন। সুতরাং তার দায়-দায়িত্ব থাকে অনেক বেশি।

আপনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি অনুষ্ঠানকে কেমন গতিতে রাখতে চান, সেটিও আপনার উপরেরই ন্যস্ত।

সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে সহজ এবং স্বাভাবিক ভাবে নিজেকে তুলে ধরাই শ্রেয়। মনে রাখবেন, দর্শকের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারলেই উপস্থাপক হিসাবে আপনি সার্থক।